Blog

আমাদের সংগঠনের ৩জন নারী বীর মুক্তিযোদ্ধারা পেলেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা 20 Apr

আমাদের সংগঠনের ৩জন নারী বীর মুক্তিযোদ্ধারা পেলেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা

আমরা গর্বিত! আমরা আনন্দিত !!
আপনাদের অভিনন্দন !!!
আমাদের অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন এর_
সহ-সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা, কোরিওগ্রাফার, নৃত্যশিল্পী এবং অভিনেত্রী, শিল্পক্ষেত্রে একুশে পদকপ্রাপ্ত লায়লা হাসান,

কার্যকরী পর্ষদের সম্মানিত সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেত্রী একাত্তরের অগ্নিকন্যা আধাপিকা কাজী রোকেয়া সুলতানা রাকা এবং

সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক, বীর মুক্তিযোদ্ধা,স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী, কণ্ঠসৈনিক, লেখিকা ও শিক্ষিকা বুলবুল মহলানবীশ।

মহান মুক্তিযুদ্ধে আপনাদের অবদান ইতিহাসের পাতায় অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লায়লা হাসান
(সহ-সভাপতি, অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন)
বিক্রমপুরের কৃতি সন্তান বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিল্পী লায়লা হাসান একজন বাংলাদেশি কোরিওগ্রাফার, নৃত্যশিল্পী এবং অভিনেত্রী। বাংলাদেশ সরকার শিল্পক্ষেত্রে তার অবদানের জন্য তাকে একুশে পদকে ভূষিত করেন।
লায়লা হাসান এর বাবা মায়ের রাখা নাম লায়লা নার্গিস রোজী। ১৯৪৭ সালের ৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে নানা খানবাহাদুর আলি আহমেদ খানের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। মায়ের নাম লতিফা খান,বাবার নাম এম এ আউয়াল।
লায়লা হাসান এর গ্রামের বাড়ি বিক্রমপুরের টঙ্গিবাড়ি উপজেলায় বেশনাল গ্রামে। তিনি অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন এর কেন্দ্রীয় পর্ষদের সহ সভাপতি।
বাবা কোয়াপারেটিভ কলেজের ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। মা ছিলেন কাস্টমস এর কর্মকর্তা। এম এ আউয়াল অবসরে বাঁশি বাজাতেন, আর লতিফা খান সেতার।
লায়লা নার্গিস এর ছোটবেলা কাটে ঢাকার টিকাটুলি এলাকায়। একটু বড় হবার পর মায়ের বদলির চাকরির কারণে নানা, নানি, মামা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ খান সরোয়ার মুরশিদ, মামি রাজনীতিবিদ নুরজাহান মুরশিদ, মামাতো ভাই বোনের যৌথ পরিবারে বড় হন তিনি।
তখন পুরো টিকাটুলি পাড়াটির ছিল এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ওখানে থাকতেন সুফিয়া কামাল, মোদাম্বের হোসেন, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক প্রমুখ। এসব মানুষদের সন্তানদের সাথে রামকৃষ্ণ মিশনে, গোলাপবাগে ফুল কুড়িয়ে শৈশব কাটে লায়লা নার্গিসের।
লায়লা নার্গিস রোজীর নৃত্যজীবন শুরু হয় মাত্র দু’বছর বয়সে। স্টেজে নাচলে দেখা যায় না বলে আরেকটা টেবিল এনে তার ওপরে দাঁড় করিয়ে দেয়া হতো। সেই থেকেই শুরু। বিদ্যালয় জীবন শুরু করেন নারীশিক্ষা মন্দিরে, পরবর্তীকালে কামরুন্নেসা স্কুলে।
নাচ শিখতেন বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে। সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজের পর ভর্তি হন বেগম বদরুন্নেসা কলেজে। সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে। তবে পড়াশুনার সাথে নাচ চলেছে একই ছন্দে। চলেছে রেডিও নাটকে অভিনয়।
১৯৬৫ সালে চলচ্চিত্রের নায়ক সৈয়দ হাসান ইমামকে বিয়ে করেন লায়লা। শুরু হয় এক ছন্দবদ্ধ যুগলবন্দীর। লায়লা নার্গিস হয়ে যান সবার প্রিয় লায়লা হাসান।
নতুন পরিবারের অনুপ্রেরণায় গতিময় হয় সংস্কৃতির সঙ্গে পথচলা। একে একে কোল জুড়ে আসে ৩টি সন্তান। কিন্তু সন্তান, শ্বাশুড়ি, স্বামীসহ যৌথ পরিবারের বহু কাজের মাঝেও নাচের মহড়া, টিভি নাটক, এমনকি কিছুদিন মঞ্চ নাটকও চলতে থাকে। সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হয়েও বিদেশে গিয়েছেন বহুবার।
খেলাঘল কেন্দ্রীয় প্রেসিডায়াম সদস্য। ষাটের দশকে আইয়ুব খান যখন রবীন্দ্র জয়ন্তী উদযাপন নিষিদ্ধ করলো খেলাঘর ৩দিনের রবীন্দ্র জয়ন্তী করার সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু রিহার্সাল করার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না।নিজের বাড়িতে রিহার্সালের ব্যবস্থা করলেন সৈয়দ হাসান ইমাম ও লায়লা হাসান।সেই থেকে আজ পর্যন্ত খেলাঘরকে আগলে রেখেছেন লায়লা হাসান।৯২সালে যখন খেলাঘর এর উপর আঘাত আসে পর্বতের ন্যায় শক্ত ভাবে হাল।আজও ছুটে চলেছেন-কোন শাখা বা আসরের ডাকেও নিরাশ করেন না।সারা দেশের লক্ষ খেলাঘরের কর্মীদের অনুপ্রেরণার আরেক নামলায়লা হাসান।
অগণিত সংগঠনের পক্ষ থেকে স্বীকৃতি ও পুরস্কার পেয়েছেন লায়লা হাসান। একুশে পদক প্রাপ্তি এনে দেয় রাষ্ট্রীয় সম্মান। একুশে পদকে প্রাপ্ত সব অর্থ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃত্য বিভাগ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করে বিভাগ প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক কার্যক্রমে দান করেন।
নানা সংগঠনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বর্তমানে নিজেই চালাচ্ছেন নটরাজ নামে একটি নৃত্য শেখার সংগঠন। এছাড়াও নৃত্যশিল্পী সংস্থার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
প্রতিষ্ঠা কাল থেকেই জাতীয় নবান্ন উৎসব উদযাপণ পর্ষদের কর্ণধার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন এই গুণী শিল্পী।
লায়লা হাসান প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী মণিবর্ধন মহাশয়, অজিত সান্যাল, বাবু রাম সিংহ, জিএ মান্নান এবং বাফার শমর ভট্টাচার্য্য প্রমুখ খ্যাতিমান নৃত্য শিক্ষা গুরুর কাছে শিক্ষাগ্রহণ করেন।
তিনি ১৯৮০-৮৫ কালপর্বে বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত টেলিভিশন অনুষ্ঠান “রুমঝুম” এর জনপ্রিয় উপস্থাপিকা ছিলেন। ঐ অনুষ্ঠান থেকেই বর্তমানের জনপ্রিয় তারকা ঈশিতা, তারিন, শ্রাবন্তী, রিয়া এবং রিচির মতো খ্যাতিমান শিল্পীরা উঠে আসে।
লায়লা হাসান বেশ কিছু সংখ্যক থিয়েটার, টেলিভিশন নাটক, চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। কঙ্কাবতীর ঘাটে, রক্তকরবী, ছুটি, মায়ার খেলা, রাজা রাণী, তাসের দেশ, স্বর্গ হতে বিদায়, শ্যামল মাটির ধরাতলে, নীল দর্পন, দত্ত, কেরানির জীবন, টেমিং অব দ্য শ্রু এবং নকশী কাথার মাঠ ইত্যাদি বিষয়ে তিনি অনুষ্ঠান করেছেন।
তার টিভি নাটকগুলো হল মন পবনের নাও, কাজল রেখা, ভেলুয়া সুন্দরী, মহুয়া, রাণী ভবানীর পথ, রত্নদ্বীপ, পাশাপাশি এবং আশ্চর্য এক রাতের গল্প। তার অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো হল ঘরে বাইরে, এইতো প্রেম, ডনগিরি ইত্যাদি।
তিনি নৃত্যসংঘ “নটরাজ” প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৯০ সালে। ১৯৯৬ সালে নটরাজ থিয়েটার এবং নাঈম হাসান সুয়জার সাথে মঞ্চনাটক করতে শুরু করে। লায়লা হাসান নটরাজের সভাপতি এবং সুজা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন।
লায়লা হাসান বাংলা একাডেমি এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল ডান্স ফেডারেশনের আজীবন সদস্য। তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য এবং বাংলাদেশ নৃত্য শিল্পী সংঘের সভাপতি।
তিনি নৃত্যবিষয়ক হৃদয়ে বাজে নূপুর (১৯৯৬) এবং চারুকলা বিষয়ে মোহনরূপে গ্রন্থ রচনা করেন।
লায়লা হাসান হাসান ইমামের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।লায়লা হাসানের মোট ছয় ভাইবোন রয়েছে। অভিনেত্রী ডেইজি আহমেদ তার এক বোন।
নিজ কর্মের স্বীকৃতি স্বরুপ লায়লা হাসান জীবনে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য পুরস্কার হলো, বাচসাস পুরস্কার (২০০১), কাজী মাহবুব উল্লাহ বেগম জেবুন্নেচ্ছা ট্রাস্ট পুরস্কার (২০০১) এবং একুশে পদক (২০১০) ইত্যাদি।
যখন একুশে পদকে সম্মানিত হন লায়লা হাসান। তখন তাঁর মনে হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃত্য বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র বিভাগ থাকা উচিত। প্রস্তাবটি নিয়ে দেখা করেন তৎকালীন উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকীর সাথে। সম্মানিত উপাচার্য এবং তৎকালীন বিভাগীয় চেয়ারম্যান ইসরাফিল শাহীনের সহযোগিতায় নানা কাগজপত্র সংগ্রহ, সিলেবাস তৈরি, শিক্ষক নিয়োগ সকল বিষয়েই অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন লায়লা হাসান আরো অনেক নৃত্যশিল্পীকে সাথে নিয়ে। অবশেষে প্রতিষ্ঠিত হয় নৃত্য বিভাগ। এ যেন লায়লা হাসানের স্বপ্নপূরণ।
=====

https://www.facebook.com/AgrasharBikrampurFoundation/photos/a.2126493834168355/2126560140828391/

একাত্তরের অগ্নিকন্যা কাজী রোকেয়া সুলতানা রাকা
(কার্যকরী পর্ষদের সম্মানিত সদস্য,অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন)

দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অনন্য অবদান রেখেছেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের নারীদের ভূমিকা অপরিসীম। যুদ্ধ শুরুর হওয়ার অনেক আগে থেকেই তাদের অনেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নেন। অংশগ্রহণ করেন। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চে ভাষণ দেয়ার পর নারী সমাজ বেশ সোচ্চার হয়ে ওঠেন।
নারী সংগঠনগুলোর পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের নিয়ে সশস্ত্র ছাত্র বিগ্রেড গড়ে তোলা হয়। ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের নেতৃত্বস্থানীয় ছাত্রীদের নেতৃত্বে বিগ্রেড পরিচালিত হতে থাকে। বিগ্রেড পরিচালনায় যে সব মেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন তাদের মধ্যে কাজী রোকেয়া সুলতানা রাকা অন্যতম।
১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয় যুদ্ধের প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ। মেয়েরা দলে দলে যোগ দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ডামি রাইফেল নিয়ে (কাঠের) তারা প্রতিদিন সকালে প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করেন। মার্চপাস্ট থেকে শুরু করে রোলিং, রেকি সবই শেখেন তারা। সাধারণ মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে দেয়ার জন্য ৮/১০দিন পর ঢাকার রাস্তায় প্রদর্শনীমূলক মার্চপাস্ট করেন এই মেয়েরা। বাংলার দামাল মেয়েদের সশস্ত্র মার্চপাস্টের এই দলে তৎকালীন ছাত্রনেত্রী কাজী রোকেয়া সুলতানা রাকা ছাড়াও আরও ছিলেন ডা. নেলি, আয়শা খানম, তাজিম সুলতানা, কাজী মমতা খানম, রওশন আরা, নাজমা বেগম চুনী, জিয়াউন নাহার রোজী, বেবী মওদুদসহ অনেকেই।
১৯৭১ সালে রোকেয়া সুলতানা রাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের আবাসিক ছাত্রী ছিলেন। ১ মার্চ শরীরে প্রচন্ড জ্বর নিয়েও হল থেকে বেড়িয়ে মিছিলের নেতৃত্ব দেন তিনি। ছেলেদের আগেই রোকেয়া হলে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে মেয়েরা প্রশিক্ষণ শুরু করেছিলো।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নারীরা কখনও গেরিলা যুদ্ধে, কখনও সম্মুখযুদ্ধে, কখনও সেবিকা হিসেবে, কখনওবা বার্তাবাহক হিসেবে অমূল্য অবদান রেখেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতা হিসেবে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সূচনালগ্ন থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন কাজী রোকেয়া সুলতানা৷ রাজধানী ঢাকা ছাড়াও যুদ্ধের সময় বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে ঘুরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি করেন তিনি৷
১৯৪৮ সালের ১৬ অক্টোবর বর্তমান মাগুরা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন কাজী রোকেয়া সুলতানা৷ ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে স্নাতক শ্রেণির ছাত্রী৷ একইসাথে প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির সাথেও সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন তিনি৷ সুবক্তা হিসেবে তার খ্যাতি সেই ছাত্র জীবন থেকেই৷ এছাড়া দেশের বিভিন্ন সংকটময় পরিস্থিতিতে নীতি নির্ধারণী ক্ষেত্রেও তার ছিল সক্রিয় অংশগ্রহণ৷
রোকেয়া এবং তার সহকর্মী ছাত্র নেতারা তাই সত্তরের নির্বাচন পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছাত্রী ও নারী সমাজকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার এবং এই প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন৷ অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে প্রায় প্রতিদিনই তাদের কাটতো মিছিল-সমাবেশ আর আন্দোলনের নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে৷ সারাদিনের কর্মসূচি শেষ হতো শহীদ মিনার চত্বরে পরের দিন কি কাজ করার হবে তার নির্দেশনা ঘোষণার মধ্য দিয়ে৷ এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়াম তথা শরীরচর্চা কেন্দ্রের সামনের মাঠে শুরু হয় মেয়েদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি৷
এ সম্পর্কে এক সাক্ষাৎকারে কাজী রোকেয়া সুলতানা বলেন, ‘আমরা যখন দেখলাম শতভাগ ছাত্রীরা বলছে, পাকিস্তানি বাহিনী যদি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাহলে আমরাও তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে রুখে দাঁড়াবো৷ এসময় সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের অস্ত্র চালনার কোন দক্ষতাই ছিল না৷ তাই আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়াম মাঠে প্রশিক্ষণ শুরু করলাম৷ প্রাথমিকভাবে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় রেঞ্জার ইউনিটের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেই৷ আমাদের হাতে ভারি অস্ত্রশস্ত্র না থাকায় আমরা পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা অভিযানের জন্যই নিজেদের বিশেষভাবে প্রস্তুত করি৷’
তিনি জানান, ২০ মার্চের পর সাধারণ মানুষের বেশে পাকসেনাদের শহরের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল৷ যাতে করে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহজ হয় পাকবাহিনীর পক্ষে৷ এ সময়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে ছাত্রীদের ঢাকায় আত্মীয় স্বজনের বাড়ি অথবা গ্রামের বাড়িতে চলে যেতে বলা হয়। ছাত্রীদের নিজ নিজ অবস্থানে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়৷
২৫ মার্চ ঢাকায় পাকসেনাদের অভিযানের বিরুদ্ধে সহকর্মীদের নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সেই স্মৃতি স্মরণ করে রোকেয়া সুলতানা জানান, ‘আমার বাড়ি ছিল ধানমন্ডিতে৷ তৎকালীন ইপিআর-এর প্রধান ফটকের কাছে৷ ২৫ মার্চ যখন বেতার সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গেল তখন আমার বাড়ির সামনে সবাই এসে জড়ো হলো। তারা জানালো, উত্তর পাড়া থেকে তারা বের হচ্ছে৷ এর অর্থ হচ্ছে সেনানিবাস থেকে তারা বের হচ্ছে৷ আমরা স্পষ্টভাবে পরিচিত শব্দ ব্যবহার করতাম না৷ যাহোক, এসময় সবাইকে বলে দিলাম, এক পাও আমরা পিছু হটবো না৷ বালির বস্তা, ইটের বোঝা, গাছপালা যা কিছু আছে সেগুলো দিয়ে বড়পথগুলোতে ব্যারিকেড তৈরি করতে বলা হলো সবাইকে৷ অল্প সময়ের মধ্যেই ঐ অঞ্চলের প্রায় সবদিকে রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়া হলো৷’
তিনি বলেন, ‘এরপরে আমাদের বাড়ির ছাদ থেকে দেখতে পেলাম প্রথমে পুলিশ লাইনে, দ্বিতীয়ত তৎকালীন ইপিআর এবং এরপরেই নিলক্ষেতে আগুন জ্বলছে৷ এভাবে রাত ১০টা থেকে প্রায় একটা-দেড়টা পর্যন্ত মুহুর্মুহু গুলির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম৷ এরপর মাইকে ঘোষণা শুনতে পেলাম উর্দু ভাষায়৷ সবাইকে বিশেষভাবে সতর্ক করে দিচ্ছিল। বলা হচ্ছিল বাড়ির ছাদ থেকে পতাকা নামিয়ে ফেলতে৷ দেখা গেছে ওই ঘোষণা শুনে যারা পতাকা নামাতে বাড়ির ছাদে উঠেছে তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হয়েছে৷ আমি দেখলাম একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক একটি শাড়ি গায়ে জড়িয়ে পতাকা নামাতে ছাদে উঠেছেন৷ সঙ্গে সঙ্গে গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি৷’
২৮ মার্চ আগরতলায় যাওয়ার জন্য সহকর্মীরা তাকে নিতে আসলেও বাবার নির্দেশের কারণে সেসময় যাওয়া হয়নি৷ এরপর ঢাকা থেকে ডেমরায় গিয়ে কিছুদিন এক শ্রমিকের বাড়িতে ছিলেন তিনি৷ সেখানে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় কাজ করেছেন৷ এরপর ১৪ এপ্রিল চলে যান কেরানিগঞ্জ এলাকায়৷
অবশেষ ৪ জুন কলকাতায় পাড়ি জমান রোকেয়া৷ সেখানে গিয়ে পুরোদমে মুক্তিযুদ্ধের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন৷ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে সভা-সমাবেশে বক্তৃতা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি করেন। ঘুরে ঘুরে ত্রাণ সংগ্রহ করেন৷ তখন থেকেই মুজিবনগর সরকারের নেতৃবৃন্দের সাথে নিয়মিত সমন্বয়ের মাধ্যমে নানা কাজে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন কাজী রোকেয়া সুলতানা৷
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কিছুদিন কমিউনিস্ট ধারার রাজনীতির সাথে জড়িত থেকে দেশ গড়ার কাজ করেন মুক্তিযোদ্ধা রোকেয়া সুলতানা৷পরে মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে শিক্ষা জগতে প্রবেশ করেন এই বীর যোদ্ধা৷ লালমাটিয়া কলেজে বাংলার অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর অবসর গ্রহণ করেন৷
=====

https://www.facebook.com/AgrasharBikrampurFoundation/photos/a.2126493834168355/2126558240828581

বুলবুল মহলানবীশ

(সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক,অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন)

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিকালে সেই সময়কার রেসকোর্স ময়দানে যখন পাক হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পন করছিল ঠিক সেই মাহন্দ্রেক্ষণে কলকাতার বালিগঞ্জের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয় ‘বিজয় নিশান উড়ছে ঐ’-গানটি।
বাঙালির বিজয়ের ঐতিহাসিক ক্ষণে কালজয়ী গানটিতে কণ্ঠ দেওয়া শিল্পীদের অন্যতম- বীর মুক্তিযোদ্ধা বুলবুল মহলানবীশ।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা বুলবুল মহলানবীশ একাধারে কবি ও লেখক; সংগীত, নাট্য ও আবৃত্তিশিল্পী। টিভি-বেতার-মঞ্চে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক অনুষ্ঠানের নন্দিত উপস্থাপক তিনি। সর্বোপরী দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

নজরুল সংগীতশিল্পী বুলবুল মহলানবীশ নজরুল সংগীত শিল্পী পরিষদের সহসভাপতি, সাধরণ সম্পাদক রবীন্দ্র একাডেমি। জাতীয় কবিতা পরিষদ, কচিকাঁচার মেল, উদীচী, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শিল্পী পরিষদসহ বহু সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপালন করছেন তিনি। তবে সব ছাপিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী- কণ্ঠযোদ্ধা পরিচয়টি বহন করেন বিনম্র গৌরবে।
তাদের দুটি গানের অ্যালবাম রয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে ১২টির বেশি গ্রন্থ। মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব প্রস্তুতি ও স্মৃতি ৭১ তার বহুল আলোচিত বই। সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য পেয়েছেন- চয়ন স্বর্ণপদক, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ফাউন্ডেশন সম্মাননা, পশ্চিমবঙ্গের নজরুল একাডেমি সম্মাননা পদক।

বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীতে চীন আন্তর্জতিক বেতারের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বরেণ্য এই কণ্ঠযোদ্ধা স্মৃতিচারণ করলেন ঠিক ৫০ বছর আগের সেই ঐতিহাসিক ক্ষণের। বললনে তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ এবং বাস্তবের বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। তরুণ প্রজন্মকে বললনে ইতিহাসলগ্ন হতে। তাঁর বিশ্বাস সুস্থ সংস্কৃতির চর্চাই সমাজকে নিয়ে যেতে পারে প্রগতির পথে। জীবনভর সংস্কৃতির পথেই তাঁর দৃপ্ত পদযাত্রা!
=====

উল্লেখ্য, যে স্বাধীনতার ৫০ বছর পর দেশের নারী মুক্তিযোদ্ধারা পেলেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। আজ মঙ্গলবার ৬৫৪ নারী মুক্তিযোদ্ধাকে সরকারের পক্ষ থেকে সম্মাননা দেয়া হয়। এর মধ্যে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠানে ৬৫ বীর মুক্তিযোদ্ধার হাতে তুলে দেয়া হয় সম্মাননা স্মারক, উত্তরীয়, শাড়ী ও স্যুভেনিয়র। বাকিদের নিজ নিজ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে সম্মাননা দেয়া হয়।
মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে উদযাপন উপলক্ষে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশজুড়ে এ আয়োজন। রাজধানীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা।
বীর মুক্তিযোদ্ধারা বিনামূল্যে হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন জানিয়ে মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, জেলা, উপজেলাসহ দেশের বিশেষায়িত হাসপাতালসমূহে চিকিৎসা, ওষুধ, টেস্ট যা প্রয়োজন তার সবই দেয়া হচ্ছে। আমরা ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নির্দিষ্ট স্থান মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার হিসেবে সংরক্ষণ করতে চাই। যেখানে মানুষ গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে পারবে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময় যে সব স্থানে যুদ্ধ হয়েছিল, সে সব স্থান আমরা সংরক্ষণ করছি। বধ্যভূমিগুলোও আমরা সংরক্ষণ করছি। এ ছাড়া যদি কোন মুক্তিযোদ্ধা মারা যান তাদের একই রকম নকশায় কবর দেয়া হবে, যেন ৫০ বছর পরেও একটি কবর দেখে বোঝা যায়, এটি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার কবর।
এসময় প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই, সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ, মুক্তিযোদ্ধাদের সহয়াতা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরজ্জ্বোল দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন নারী মুক্তিযোদ্ধারা। মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীদের আত্মত্যাগ অপরিসীম। বিধবা হতে পারেন জেনেও স্ত্রীরা স্বামীদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়েছেন। পুত্রহারা হতে পারে জেনেও মায়েরা পুত্রদেরকে রণক্ষেত্রে পাঠিয়েছে। নির্যাতিত হতে পারে জেনেও কন্যারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছরেও জাতীয় পর্যায়ে এক সঙ্গে দেশব্যাপী মহিলা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আনুষ্ঠানিক সম্মাননা প্রদান করা হয়নি। এবারই আলাদাভাবে বাংলাদেশের সকল মহিলা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একই দিনে, একই সময়ে, একই সাথে সম্মাননা দেয়া হলো। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা প্রদান একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *