Blog

ইতিহাসের সাক্ষী নাটেশ্বরের দেউল-অতীশ দীপঙ্করের সময়ের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন 23 Mar

ইতিহাসের সাক্ষী নাটেশ্বরের দেউল-অতীশ দীপঙ্করের সময়ের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

এক বছর আগেও যে জমিতে কলা চাষ করতেন মুন্সীগঞ্জের পাইকপাড়া ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক নরেশ চন্দ্র, সে জমিতে এখন চলছে হাজার বছরের ইতিহাস উন্মোচনের মহাযজ্ঞ। মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ি থানার নাটেশ্বর গ্রামে আবিষ্কৃত হয়েছে প্রাচীন বাংলার বৌদ্ধদের বিশাল স্মৃতিচিহ্ন, দেউল। পূর্বের বঙ্গ ও সমতট অঞ্চলের রাজধানী বিক্রমপুরে অবস্থিত এ দেউল (দেবালয়) বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাস সন্ধানে নতুন পথ খুলে দিয়েছে। এটি বৌদ্ধদের বিহার বা বেশ কয়েকটি মন্দিরের সমষ্টি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে এ দেউলের ইতিহাস জানা এবং এর ঐতিহ্য সংরক্ষণের কাজ চলছে পুরোদমে। গোটা দেউলের ইতিহাস জানা গেলে বাংলা এবং বিশ্বের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই স্পষ্ট হবে বলে ধারণা করছেন ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকরা। প্রখ্যাত পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্করের বাল্যজীবন, শিক্ষালাভের সূত্রও উন্মোচন করতে পারে নাটেশ্বর দেউল। সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, জাহাঙ্গীরনগর ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, ঐতিহ্য অন্বেষণ ও অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন এবং কয়েকজন বিশেষজ্ঞ দেউলটির প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, উত্খনন ও গবেষণা করছেন। প্রায় সাত একর জমি জুড়ে দেউলটি বিস্তৃত। এর মধ্যে মূল ঢিবিটির আয়তন প্রায় দুই একর। ঢিবির প্রায় ২৫ শতাংশ জমিতে বর্তমানে খনন কাজ চলছে। ২০১৩ সালের শেষার্ধ এবং এ বছরের উত্খননে নাটেশ্বর দেউলে ৯ মিটার × ৯ মিটার পরিমাপের একটি বৌদ্ধ মন্দির, অষ্টকোণাকৃতি স্তূপ, ইট নির্মিত নালা, আরো বেশ কিছু স্থাপত্যিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। বৌদ্ধ মন্দিরটির অনেকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পশ্চিম-দক্ষিণ কোণা ২৪০ মিটার উচ্চতায় টিকে আছে। ১ দশমিক ৭৫ মিটার প্রশস্ত দেয়ালের ভিত্তিমূলে ঝামা ইট ব্যবহার করা হয়েছে। সম্ভবত আদ্রতা রোধক হিসেবে ঝামা ইট বেছে নেয়া হয়েছে। মন্দিরের দেয়ালের বহিঃস্থ দিকে অসাধারণ অলংকরণ করা হয়েছে। হাতে কাটা ইটের অপূর্ব জালি নকশা এবং বিভিন্ন আকৃতির ইটের কাজ মন্দিরকে অসাধারণ নান্দনিক স্থাপত্যের রূপ দান করেছে। জানা যায়, দেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ২২-২৩টি বৌদ্ধ বিহার আবিষ্কৃত হয়েছে। নাটেশ্বর দেউলে চলমান খননের ফলে তাত্পর্যপূর্ণ প্রত্নবস্তু আবিষ্কৃত হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এটিও বিহার হিসেবে প্রমাণিত হলে বিক্রমপুরের ও বাংলার আঞ্চলিক ইতিহাসের অনেক সূত্রই খুঁজে পাওয়া যাবে। পুরো ব্যাপারটি নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয়দের মাঝে। এমনকি দেশের ও দেশের বাইরের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও ব্যাপক উত্সাহ তৈরি হয়েছে নাটেশ্বরের বৌদ্ধ বিহারকে কেন্দ্র করে। বৌদ্ধ ভিক্ষু, গুরু ও ধর্মাবলম্বীরা দেউলটি দেখার জন্য প্রায়ই ভিড় করছেন। এ প্রসঙ্গে দেউলটির গবেষণা অনুসন্ধান ও খনন কার্যক্রমের পরিচালক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিক্রমপুর অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্য অনেক বেশি সমৃদ্ধ। কিন্তু এখনও এর প্রায় পুরোটাই অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। এ দেউলের ইতিহাসের সন্ধানের মাধ্যমে সেই ঐতিহ্যেরও খোঁজ পাওয়া সম্ভব হবে। এ জন্য সরকারের বিপুল সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতাও প্রয়োজন। তিনি বলেন, টঙ্গিবাড়ী থানার নাটেশ্বর গ্রামের বিশাল আকৃতির দেউলটি (মন্দির ও সংলগ্ন স্থাপত্য) প্রায় ৭ একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত। গত বছর থেকে ধারাবাহিক প্রত্নতাত্ত্বিক খননে বেরিয়ে আসছে একের পর এক স্থাপত্যিক নিদর্শন—বৌদ্ধ মন্দির, অষ্টকোণাকৃতি স্তূপ, দেয়াল, ইট নির্মিত নালা। দেউলের ধরণ ও বৈশিষ্ট্য দেখে এটিকে এখনও বৌদ্ধবিহার বলা যায় না। আরো গবেষণা ও খননের পর এটি স্পষ্ট হবে। বিহার না হলেও অনেকগুলো মন্দিরের সমষ্টি হবে। যেভাবে নাটেশ্বর দেউলের আবিষ্কার- ঐতিহ্য অন্বেষণ ও অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা যায়, মুন্সিগঞ্জে বৌদ্ধদের ইতিহাসের ধারা সন্ধান করতেই ২০১০ সাল থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও খনন কাজ শুরু করা হয়। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহায়তায় ঐ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক প্রত্নতাত্ত্বিক খনন। ২০১০ সালেই জেলা সদরের রামপাল ও বজ্রযোগিনী ইউনিয়নের তিনটি গ্রামে ৯টি পরীক্ষামূলক উত্খনন পরিচালিত হয়। প্রতিটি প্রত্নস্থানে প্রাচীন বসতির চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়। রঘুরামপুরে ইট-নির্মিত একটি দেয়ালের অংশ বিশেষ আবিষ্কৃত হয়। রঘুরামপুরে তিন বছর ধারাবাহিক উত্খননে আবিষ্কৃত হয়েছে একটি বৌদ্ধ বিহারের ছয়টি ভিক্ষু কক্ষ এবং পঞ্চস্তূপ। এটি দশম-একাদশ শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছে বলে নিরীক্ষায় জানা যায়। বিহারটির ভিক্ষু কক্ষগুলো উত্তর এবং পশ্চিম দিকে ধাবমান। এর স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য দেখে আশপাশেও আরো বিহার বা বৌদ্ধ মন্দির থাকার ধারণা করেন বিশেষজ্ঞরা। ২০১২ সালে এজন্য তারা অনুসন্ধানও শুরু করেন। ঐ বছরই তারা নাটেশ্বর দেল (দেউল) সম্পর্কে জানতে পারেন। এখানকার বিক্ষিপ্ত ইট নিরীক্ষা করে এখানেও বিহার থাকার সম্ভাবনা অনুভব করেন সংশ্লিষ্টরা। এরপর ২০১৩ সালে তারা খনন কাজ শুরু করেন এবং আবিষ্কৃত হয় দেউল। এটিও দশম বা একাদশ শতকে নির্মিত হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় কৃষক আবু নাছের (৭২) বলেন, ছোটোবেলা থেকেই দেউল অঞ্চলটিকে তারা নাটেশ্বর দেল বলে আসছেন। এখানে ছোট একটি পুকুর খননের সময় প্রচুর ইট ও পাথর পাওয়া যায়। কৃষিকাজের জন্য মাটি খনন করলেও অনেক ইট পাওয়া যেত। এ থেকে আমরা এখানে বড় কোনো প্রাসাদ আছে বলেই ধারণা করতাম। গত বছর আমাদের ধারণা সত্যি করে বৌদ্ধদের মন্দির আবিষ্কৃত হয়।’ এ প্রসঙ্গে গবেষক দলের অন্যতম সদস্য এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান মো. সোহরাব উদ্দিন বলেন, দেশে প্রায় ২২/২৩টি বিহার আবিষ্কৃত হয়েছে। নাটেশ্বরেও বিহার আবিষ্কারের সম্ভাবনাই প্রবল। মন্দির ও স্তূপের পার্শ্বে বিহার থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশাল আকৃতির প্রত্নতাত্ত্বিক ঢিবির পশ্চিম পাশে আপাতত একটি স্বতন্ত্র স্থাপত্য আবিষ্কৃত হচ্ছে যা দেখে মনে হতে পারে নাটেশ্বরে ছিল প্রাচীনকালের মন্দিরের সমাহার। এটি একটি বিপুল সম্ভাবনাময় প্রত্নস্থান। তিনি বলেন, মুন্সিগঞ্জের রামপাল, বজ্রযোগিনী ও টঙ্গীবাড়ী ইউনিয়নে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও খননের ফলে ইতোমধ্যে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থান ও প্রত্নবস্তু আবিষ্কৃত ও সংগৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, প্রায় পাঁচ ফুট দৈর্ঘ্যের কালো ব্যাসাল্ট পাথরের অক্ষত বৌদ্ধ দেবী মূর্তি, প্রাচীন নৌকা, দারু (কাঠ) ভাস্কর্য, কাঠের অলঙ্কৃত স্তম্ভ, পোড়ামাটির ফলক ও মৃত্পাত্র। অনুসন্ধান, উত্খনন ও গবেষণা ধারাবাহিকভাবে চালাতে পারলে বিক্রমপুর অঞ্চলে আরও একাধিক বৌদ্ধ বিহারই নয়, আবিষ্কৃত হবে উন্নত নগর সভ্যতার অভাবিত সব নিদর্শন। নাটেশ্বরের সদ্য আবিষ্কৃত এ বৌদ্ধ দেউলটি সংরক্ষণে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রাচীন স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে কাদামাটির মর্টার, পুরনো ইট পুনঃব্যবহার ও ঐতিহ্যবাহী কুমারদের দ্বারা তৈরি বিভিন্ন আকারের ইট ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশে এটিই প্রথম কোনো স্থাপত্য নিদর্শন যা প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। স্থানীয় ভূমি অফিস ও বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, বর্তমানে যে স্থানে নাটেশ্বর দেউলটি অবস্থিত রয়েছে তার প্রায় অধিকাংশ জমি পৈতৃক সূত্রে ভোগদখল করে আসছিলেন পাইকপাড়া ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক নরেশ চন্দ্র। ৫ একর ৭০ শতাংশ জায়গা। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকে তিনি ঐ স্থানে পান চাষ করলেও গত ১০ বছর ধরে কলা চাষ করছিলেন। দেউলটি আবিষ্কারে পর তিনি জায়গাটি ছেড়ে দিয়েছেন। নরেশ চন্দ্র বললেন, দেশের ইতিহাস জানতে যদি এ দেউল ভূমিকা রাখে, তবে তার জন্য এর চেয়ে সুখকর বিষয় আর নেই। একে ঘিরে পর্যটন সুবিধা গড়ে উঠলে আমাদের অর্থনেতিক উন্নয়ন অর্জিত হবে। মুন্সীগঞ্জের গৌরব ছড়িয়ে পড়বে। প্রাচীন বাংলার সমৃদ্ধ জনপদ বিক্রমপুর বঙ্গ ও সমতট অঞ্চলের রাজধানী ছিল। প্রাচীন তাম্রলিপিতে একে ‘শ্রীবিক্রমপুর-সমাবাসিত-শ্রীমজ্জায় স্কন্ধাবারাত্’ অর্থাত্ ‘বিজয় শিবির বা রাজধানী’ হিসেবে এবং কোনো কোনো লিপিতে ‘শ্রীবিক্রমণিপুর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনীর কীর্তিমান সন্তান ছিলেন অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান (৯৮০-১০৫৪ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি বিশ্ববিখ্যাত বৌদ্ধ বিহার নালন্দায় অধ্যয়ন করেন। তাকে বিক্রমশীল মহাবিহারের অধ্যক্ষ নিয়োগ করা হয়। বৌদ্ধ ধর্মের অবক্ষয়রোধে রাজা চং ছপের বিশেষ আমন্ত্রণে অতীশ তিব্বতে গমন করেন। তিব্বতীরা তাকে সম্মানসূচক হো-বো-জে অর্থাত্ দ্বিতীয় বুদ্ধ উপাধি দিয়েছিল। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে গৌতম বুদ্ধের পরই অতীশ দীপঙ্করের স্থান। কিন্তু তার বাল্যজীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। বাল্যজীবনে তিনি কোথায় শিক্ষাগ্রহণ করেন এবং কিভাবে বৌদ্ধ ধর্মে বুত্পত্তি অর্জন করেন, তা এখনও সুস্পষ্ট নয়। রঘুরামপুর বিহার এবং নাটেশ্বর দেউল আবিষ্কার সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে বলে আশা করছেন প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিকরা। [সংগ্রহ; মাহবুব রনি]

অবস্থান ও যাতায়াত

ঢাকার গুলিস্তান গোলাপশাহ এর মাজারের নিকট হতে (বেতকা-টংগিবাড়ী)এস এস অথবা ডি.এম পরিবহনে চড়ে টংগিবাড়ী উপজেলার সামনে নেমে অটো রিক্সা অথবা রিক্সায় করে যেতে পারবেন। ঢকা থেকে ভাড়া ৫৫টাকা ও টংগিবাড়ী থেকে নাটেশ্বর অটোতে ভাড়া জন প্রতি ১০টাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *