Blog

টঙ্গীবাড়ি উপজেলার নাটেশ্বরে হাজার বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ নগরী 08 Apr

টঙ্গীবাড়ি উপজেলার নাটেশ্বরে হাজার বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ নগরী

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ : বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ খননে মুন্সীগঞ্জের নাটেশ্বরে ৫টি নির্মাণযুগসহ প্রায় এক হাজার বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ নগরী আবিস্কার হয়েছে।
বিক্রমপুর অঞ্চলে তাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা প্রকল্পের পরিচালক নূহ-উল-আলম লেনিন সোমবার দুপুরে খননস্থলে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে একথা জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি এবং চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিংকিং বিশেষ অতিথি ছিলেন। এসময় জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল, পুলিশ সুপার বিপ্লব বিজয় তালুকদার, প্রকল্পটির গবেষণা পরিচালক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান, চীনের হুনান প্রভেন্সিয়াল ইনস্টিটিউট অব কালচারাল রেলিকস এন্ড আর্কিওলজির অধ্যাপক চাই হুয়াংবো এবং টঙ্গীবাড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান ইজ্ঞিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।


দশ বছর আগেও অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক নরেশ চন্দ্র দাসের পানের বরজ ছিল সেখানে। একদল প্রত্নতাত্তি্বকের ধারাবাহিক অনুসন্ধানে তার পানের বরজের নিচেই সন্ধান মিলেছে এক হাজার বছরের পুরনো বৌদ্ধ নগরীর। মুন্সীগঞ্জের (বিক্রমপুর) টঙ্গিবাড়ী উপজেলার নাটেশ্বর গ্রামে বিশাল আকৃতির দেউলে (প্রায় ১০ একর) একের পর এক বেরিয়ে এসেছে বৌদ্ধ মন্দির, অষ্টকোণাকৃতি স্তূপ, চার মিটার প্রশস্ত সীমানা প্রাচীরসহ বিস্ময়কর সব স্থাপনা। ‘বিক্রমপুরের উন্নত সভ্যতার প্রায় সব প্রত্ন-নিদর্শন কীর্তিনাশা পদ্মাগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে’- বহুকাল ধরে চলমান এ ধারণাকে ভুলপ্রমাণ করে দিয়েছে নতুন এসব আবিষ্কার। 

    

  অনুসন্ধান কাজের উদ্যোক্তা সংগঠন ‘অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনে’র সভাপতি ড. নূহ-উল-আলম লেনিন জানান, নাটেশ্বরের প্রত্নস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে প্রায় ৭ মিটার গভীরতায় প্রাপ্ত পাঁচটি নির্মাণযুগের প্রত্ন-নিদর্শন, যা বিক্রমপুর অঞ্চলে দীর্ঘ সময়ব্যাপী এক সমৃদ্ধ সভ্যতার সাক্ষ্য বহন করছে। এত সুন্দর পুরনো নির্মাণশৈলীর আবিষ্কার মানব ইতিহাসে নতুন সভ্যতার সংযোজন ঘটাবে। এ আবিষ্কারকে ‘ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য’ভুক্ত করতে পারায় আশাবাদ ব্যক্ত করে এখানে প্রত্নতাত্তি্বক পার্ক, জাদুঘর, নাট্যশালা ও ডিজিটাল হল নির্মাণ করার কথা বলেন তিনি।

প্রাচীন বঙ্গ এবং সমতট জনপদের রাজধানী বিক্রমপুর একটি সমৃদ্ধ জনপদ। প্রাচীন বিক্রমপুর ঢাকা ও ফরিদপুর জেলার বিস্তৃত অঞ্চল নিয়ে গঠিত থাকলেও বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত ৫টি উপজেলাই কেবল ‘বিক্রমপুর’ পরিচয় বহন করে।

‘অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন’ ২০১০ সালে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় এ অঞ্চলে প্রত্নতাত্তি্বক খননের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ড. নূহ-উল-আলম লেনিনের পরিচালনায় এবং অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের তত্ত্বাবধানে ‘ঐতিহ্য অন্বেষণ’র গবেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এ খনন কাজে অংশ নেন। গত পাঁচ বছর ধারাবাহিক খনন ও গবেষণায় রঘুরামপুরে আবিষ্কৃত হয়েছে একটি বৌদ্ধ বিহারের অংশবিশেষ। ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে টঙ্গিবাড়ী ইউনিয়নের নাটেশ্বর দেউল থেকে আবিষ্কৃত হয় মন্দির ও স্তূপ স্থাপত্যের অংশবিশেষ। ২০১৫ সালে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত হয় চীনের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ইউনান প্রাদেশিক ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক চাই হুয়াংবোর নেতৃত্বে চার সদস্যের গবেষক দল। যৌথ এ গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে নতুন সব স্থাপত্য নিদর্শন।

গবেষণা কাজের তত্ত্বাবধায়ক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রায় দু’মাসের পরিচালিত খননে নাটেশ্বরে আবিষ্কৃত হয়েছে অষ্টোকোণাকৃতি স্তূপের অবশিষ্ট অসাধারণ বাহু, কোণ এবং অভ্যন্তরীণ স্তূপ, চ্যাম্বার, মণ্ডপ প্রভৃতি। সদ্য আবিষ্কৃত চার মিটার প্রশস্ত সীমানা প্রাচীর বিশিষ্ট দুই জোড়া চতুস্র্তূপ বাংলাদেশের স্তূপের ইতিহাসে একটি অভিনব সংযোজন।

তিনি জানান, আর্দ্রতারোধক হিসেবে ভিত্তি দেয়ালে ঝামা ইটের ব্যবহার, চারটি স্তূপের স্থানিক পরিমিতি, বর্গাকৃতি ভারসাম্য, দেয়ালের অপ্রচলিত নজিরবিহীন কাঠামো বাংলাদেশের প্রাচীন উন্নত স্থাপত্য ইতিহাসে একটি নতুন সংযোজন। প্রায় ১ হাজার বছরের প্রাচীন ইট-নির্মিত দুটি পাকা রাস্তার আবিষ্কার তৎকালীন সড়ক নির্মাণ কৌশলের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দেউলের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে আবিষ্কৃত হচ্ছে ইট-নির্মিত ২.৭৫ মিটার প্রশস্ত আঁকাবাঁকা একটি বিশেষ দেয়াল; যা একটি বিস্ময়কর স্থাপত্যের আভাস দিচ্ছে।

২০১৪-১৫ সালে অনবদ্য এসব আবিষ্কারের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরতে গতকাল সোমবার টঙ্গিবাড়ী উপজেলার নাটেশ্বরে ‘অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন’ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। নূহ-উল-আলম লেনিনের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মিজানুর রহমান জামির সঞ্চালনায় আরও উপস্থিত ছিলেন চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিংচ্যাং, অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান, মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সাইফুল হাসান বাদল, জেলা পুলিশ সুপার বিপ্লব বিজয় তালুকদার, টঙ্গিবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান প্রকৌশলী কাজী আবদুল ওয়াহিদ প্রমুখ।

ড. গওহর রিজভী বলেন, নতুন এ সভ্যতার সন্ধান বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *